BCS Bangla Lecture – 12

উপসর্গ, পদাশ্রিত নির্দেশক, বচন, লৈঙ্গিক শব্দ, নমুনা প্রশ্ন

উপসর্গ

বাংলা ভাষায় কতগুলো অব্যয়সূচক শব্দাংশ রয়েছে যা স্বাধীন পদ হিসেবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না। এগুলো একটি অর্থবোধক শব্দের আগে বসে। ভাষায় ব্যবহৃত এ সব অব্যয়সূচক শব্দাংশের নাম উপসর্গ (Prefix)।

যেমন –  ‘কাজ’ একটি শব্দ। এর আগে ‘অ’ অব্যয়টি যুক্ত হলে হয় ‘অকাজ’; যার অর্থ নিন্দনীয় কাজ। এভাবে ‘হার’ শব্দের শুরুতে উপসর্গ যুক্ত করলে – আহার, প্রহার, উপহার, বিহার, সংহার, পরিহার ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থে বিভিন্ন শব্দ তৈরি হয়।

এ উপসর্গগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অন্য শব্দের আগে যুক্ত হলে এদের অর্থদ্যোতকতা বা নতুন শব্দ সৃষ্টির ক্ষমতা থাকে। বাংলা ভাষায় তিন প্রকার উপসর্গ আছে : বাংলা, তৎসম (সংস্কৃত) এবং বিদেশি উপসর্গ।

বাংলা উপসর্গ

বাংলা উপসর্গ মোট ২১ টি। অ, অঘা, অজ, অনা (অন), আ, আড়, আন, আব, ইতি, উন (উনা), কদ, কু, নি, পাতি, বি, ভর, রাম, স, সা, সু, হা। বাংলা উপসর্গ সাধারণত বাংলা শব্দের পূর্বেই যুক্ত হয়। নিচে এদের প্রয়োগ দেখানো হলো –


উপসর্গ – অ 

নিন্দিত – অকেজো, অচেনা, অপয়া

অভাব – অচিন, অজানা, অথৈ

ক্রমাগত – অঝোর


উপসর্গ – অঘা

বোকা – অঘারাম, অঘাচণ্ডী


উপসর্গ – অজ

নিতান্ত (মন্দ) –  অজপাড়াগাঁ, অজমূর্খ, অজপুকুর


উপসর্গ – অনা

অভাব – অনাবৃষ্টি, অনাদর

ছাড়া – অনাচার

অশুভ – অনামুখো


উপসর্গ – আ

অভাব – আকাঁড়া, আধোয়া, আলুনি

বাজে, নিকৃষ্ট – আগাছা


উপসর্গ – আড়

বক্র – আড়চোখ

আধা, প্রায় – আড়ক্ষ্যাপা, আড়পাগলা

বিশিষ্ট – আড়গড়া, আড়কাঠি


উপসর্গ – আন

না – আনকোরা

বিক্ষিপ্ত – আনচান, আনমনা


উপসর্গ – আব

অর্থদ্যোতকতা – অস্পষ্টতা

উদাহরণ – আবছায়া, আবডাল


উপসর্গ – ইতি

পুরোনো – ইতিকথা, ইতিহাস


উপসর্গ – উনা (উন)

কম – উনপাঁজুরে


উপসর্গ – কদ

নিন্দিত – কদবেল, কদর্য, কদাকার


উপসর্গ – কু

কুৎসিত/অপকর্ষ – কুঅভ্যাস, কুকথা, কুনজর, কুসঙ্গ


উপসর্গ – নি 

নাই – নিখোঁজ, নিলাজ, নিরেট, নিটোল


উপসর্গ – পাতি

ক্ষুদ্র – পাতিহাঁস, পাতিলেবু, পাতকুয়ো


উপসর্গ – বি

ভিন্নতা/নাই – বিভূঁই


উপসর্গ – ভর

পূর্ণতা – ভরপেট, ভরদুপুর, ভরপুর


উপসর্গ – রাম

বড়/উৎকৃষ্ট – রামছাগল, রামদা, রামশিঙ্গা


উপসর্গ – স

সঙ্গে – সলাজ, সঠিক, সরব, সজোর


উপসর্গ – সা

উৎকৃষ্ট –  সাজোয়ান


উপসর্গ – সু

উত্তম – সুনজর, সুখবর, সুদিন, সুনাম


উপসর্গ – হা

অভাব – হাপিত্যেশ, হাভাতে, হাঘরে


তৎসম (সংস্কৃত) উপসর্গ

তৎসম উপসর্গ ২০ টি। প্র, পরা, অপ, সম, নি, অনু, অব, নির (নিঃ), দুর (দুঃ), বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অতি, অপি, অভি, উপ, আ। সংস্কৃত উপসর্গ তৎসম শব্দের আগে বসে। নিচে এদের প্রয়োগ দেখানো হলো –


উপসর্গ – প্র

প্রকৃষ্ট/সম্যক (সম্পূর্ণ)  – প্রভাব, প্রচলন, প্রস্ফুটিত

খ্যাতি – প্রসিদ্ধ, প্রতাপ

আধিক্য – প্রগাঢ়, প্রচার, প্রবল, প্রসার

গতি – প্রবেশ, প্রস্থান

ধারা-পরম্পরা –  প্রপৌত্র, প্রশাখা, প্রশিষ্য


উপসর্গ – পরা

আতিশয্য (প্রচুর) – পরাক্রান্ত, পরায়ণ

বিপরীত – পরাজয়


উপসর্গ – অপ

বিপরীত – অপমান, অপচয়, অপবাদ

নিকৃষ্ট – অপসংস্কৃতি, অপকর্ম, অপসৃষ্টি

স্থানান্তর – অপসারণ, অপহরণ

বিকৃত – অপমৃত্যু


উপসর্গ – সম

সম্যক –  সম্পূর্ণ, সমৃদ্ধ, সমাদর

সম্মুখে – সমাগত, সম্মুখ


উপসর্গ – নি

নিষেধ – নিবৃত্তি

নিশ্চয় –  নিবারণ, নির্ণয়

আতিশয্য – নিদাঘ (উত্তাপ), নিদারুণ

অভাব – নিষ্কলুষ, নিষ্কাম


উপসর্গ – অনু

পশ্চাৎ – অনুশোচনা, অনুগামী, অনুকরণ

সাদৃশ্য – অনুবাদ, অনুকার

পৌনঃপুন্য – অনুক্ষণ, অনুশীলন, অনুদিন

সঙ্গে – অনুকূল, অনুকম্পা


উপসর্গ – অব

হীনতা – অবজ্ঞা, অবমাননা

নিম্নে/অধোমুখিতা – অবতরণ, অবরোহণ

অল্পতা – অবশেষ, অবেলা, অবসান


উপসর্গ – নির

অভাব – নিরক্ষর, নিরাশ্রয়, নির্ধন, নির্জীব

নিশ্চয় – নির্ধারণ, নির্ণয়, নির্ভর

বাহির – নির্গত, নিঃসরণ, নির্বাসন


উপসর্গ – দুর

মন্দ –  দুর্ভাগ্য, দুর্দশা, দুর্নাম

কষ্টসাধ্য – দুর্লভ, দুর্গম, দুরতিক্রম্য


উপসর্গ – বি

বিশেষ – বিশুদ্ধ, বিজ্ঞান, বিবস্ত্র, বিধৃত

অভাব – বিনিদ্র, বিবর্ণ, বিশৃঙ্খল, বিফল

গতি – বিচরণ, বিক্ষেপ


উপসর্গ – অধি

আধিপত্য – অধিকার, অধিপতি, অধিবাসী,

উপরি –  অধিরোহণ, অধিষ্ঠান


উপসর্গ – সু

উত্তম – সুকণ্ঠ, সুকৃতি, সুপ্রিয়, সুনীল

সহজ – সুগম, সুসাধ্য, সুলভ

আতিশয্য – সুচতুর, সুকঠিন, সুনিপুণ, সুতীক্ষ্ন


উপসর্গ – উৎ

ঊর্ধ্বমুখিতা – উদ্যম, উন্নীত, উদগ্রীব, উত্তোলন

আতিশয্য – উচ্ছেদ, উত্তপ্ত, উৎফুল্ল, উৎসুক

প্রস্তুতি – উৎপাদন, উচ্চারণ

অপকর্ষ – উৎকোচ, উচ্ছৃঙ্খল, উৎকট


উপসর্গ – পরি

বিশেষ – পরিপক্ব, পরিপূর্ণ, পরিবর্তন

সম্যক – পরীক্ষা, পরিমাণ

চতুর্দিক – পরিক্রমণ, পরিমণ্ডল


উপসর্গ – প্রতি

সদৃশ – প্রতিমূর্তি, প্রতিধ্বনি

বিরোধ – প্রতিবাদ, প্রতিদ্বন্দ্বী

পৌনঃপুন্য – প্রতিদিন, প্রতিমাস

অনুরূপ – প্রতিঘাত, প্রতিদান, প্রত্যুপকার


উপসর্গ – অতি

আতিশয্য – অতিকায়, অত্যাচার, অতিশয়

অতিক্রম –  অতিমানব, অতিপ্রাকৃত


উপসর্গ – অভি

সম্যক – অভিব্যক্তি, অভিজ্ঞ, অভিভূত

গমন – অভিযান, অভিসার

সম্মুখ –  অভিমুখ, অভিবাদন


উপসর্গ – অপি 

বন্ধন –  অপিনিহিতি, অপিনদ্ধ


উপসর্গ – উপ

সামীপ্য – উপকূল, উপকণ্ঠ

সদৃশ – উপদ্বীপ, উপবন

ক্ষুদ্র – উপগ্রহ, উপসাগর, উপনেতা

বিশেষ –  উপনয়ন, উপভোগ


উপসর্গ – আ

পর্যন্ত – আকণ্ঠ, আমরণ, আসমুদ্র,

ঈষৎ – আরক্ত, আভাস

বিপরীত – আদান, আগমন


দ্রষ্টব্য

বাংলা উপসর্গের মধ্যে ‘আ, সু, বি, নি’ এ চারটি উপসর্গ তৎসম শব্দেও পাওয়া যায়। বাংলা ও সংস্কৃত উপসর্গের মধ্যে পার্থক্য হলো, যে শব্দটির সঙ্গে উপসর্গ যুক্ত হয় সে শব্দটি বাংলা হলে উপসর্গটি বাংলা, আর সে শব্দটি তৎসম হলে সে উপসর্গটিও তৎসম হয়।

যেমন – আকাশ, সুনজর, বিনাম, নিলাজ বাংলা শব্দ। অতএব উপসর্গ ‘আ, সু, বি, নি’ বাংলা। আর আকণ্ঠ, সুতীক্ষ্ন, বিপক্ষ ও নিদাঘ তৎসম শব্দ। কাজেই এ সব শব্দের উপসর্গ ‘আ, সু, বি, নি’ তৎসম উপসর্গ।

বিদেশি উপসর্গ

ফারসি উপসর্গ


উপসর্গ – কার 

কাজ – কারখানা, কারসাজি, কারচুপি, কারবার, কারদানি


উপসর্গ – দর 

মধ্যস্থ/অধীন – দরপাট্টা, দরপত্তনী


উপসর্গ – না

না – নালায়েক, নারাজ, নাবালক, নামঞ্জুর, নাখোশ


উপসর্গ – নিম

আধা/অর্ধ –  নিমরাজি


উপসর্গ – ফি

প্রতি – ফি-মার, ফি-বছর, ফি-হপ্তা, ফি-রোজ


উপসর্গ – বদ

মন্দ – বদনাম, বদহজম, বদরাগী, বদমেজাজ


উপসর্গ – বে

না – বেআদব, বেমালুম, বেশরম, বেকায়দা, বেতার, বেকার


উপসর্গ – বর

বাইরে/মধ্যে – বরখাস্ত, বরদাস্ত, বরবাদ, বরখেলাপ


উপসর্গ – ব

সহিত – বকলম, বনাম


উপসর্গ – কম

স্বল্প – কমবখ্ত, কমজোর

আরবি উপসর্গ


উপসর্গ – আম

সাধারণ – আমদরবার, আমমোক্তার


উপসর্গ – খাস

বিশেষ – খাসমহল, খাসদরবার, খাসখবর


উপসর্গ – লা

না – লাখেরাজ, লাওয়ারিশ, লাপাত্তা


উপসর্গ – গর

অভাব – গররাজি, গরমিল, গরহাজির


উপসর্গ – খয়ের

ভাল/উৎকৃষ্ট – খয়ের খাঁ


উপসর্গ – বাজে

মন্দ/নিকৃষ্ট – বাজে কাজ, বাজে কথা

ইংরেজি উপসর্গ


উপসর্গ – ফুল

পূর্ণ – ফুল-বাবু, ফুল-প্যান্ট, ফুল-হাতা


উপসর্গ – হাফ

আধা – হাফ-হাতা, হাফ-প্যান্ট, হাফ-টিকেট


উপসর্গ – হেড

প্রধান – হেড-মাস্টার, হেড-পণ্ডিত, হেড-মৌলভি


উপসর্গ – সাব

অধীন – সাব-অফিস, সাব-জজ, সাব-ইন্সপেক্টর

উর্দু-হিন্দি উপসর্গ


উপসর্গ – হর

প্রতি/প্রত্যেক – হররোজ, হরহামেশা, হরবেলা


উপসর্গ – হরেক

বিভিন্ন – হরেক-রকম, হরেক-মাল

পদাশ্রিত নির্দেশক

কয়েকটি অব্যয় বা প্রত্যয় কোনো না কোনো পদের আশ্রয় বা পরে সংযুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা জ্ঞাপন করে, এগুলোকে পদাশ্রিত অব্যয় বা পদাশ্রিত নির্দেশক বলে। বাংলায় নির্দিষ্টতা জ্ঞাপক প্রত্যয় ইংরেজি Definite Article ‘The’-এর স্থানীয়। বচনভেদে পদাশ্রিত নির্দেশকের বিভিন্নতা প্রযুক্ত হয়।

(ক) এক বচনে: টা, টি, খানা, খানি, গাছা, গাছি ইত্যাদি নির্দেশক ব্যবহৃত হয়।

যেমন –  টাকাটা, বাড়িটি, কাপড়খানা, বইখানি, লাঠিগাছা, চুড়িগাছি ইত্যাদি।

(খ) বহু বচনে: গুলি, গুলা, গুলো, গুলিন প্রভৃতি নির্দেশক প্রত্যয় সংযুক্ত হয়।

যেমন – মানুষগুলি, লোকগুলো, আমগুলো, পটলগুলি ইত্যাদি।

(গ) কোনো সংখ্যা বা পরিমাণের স্বল্পতা বোঝাতে টে, টু, টুক, টুকু, টুকুন, টো, গোটা ইত্যাদির প্রয়োগ হয়।

যেমন – চারটে ভাত, পানিটুক, দুধটুকু, দুধটুকুন, দুটো ভাত, গোটা চারেক আম, একটু কথা ইত্যাদি।


পদাশ্রিত নির্দেশকের ব্যবহার

১. (ক) ‘এক’ শব্দের সঙ্গে টা, টি যুক্ত হলে অনির্দিষ্টতা বোঝায়। যেমন  – একটি দেশ, সে যেমনই হোক দেখতে।

কিন্তু অন্য সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে টা, টি যুক্ত হলে নির্দিষ্টতা বোঝায়। যেমন – তিনটি টাকা, দশটি বছর।

(খ) নিরর্থকভাবেও নির্দেশক টা, টি-র ব্যবহার লক্ষণীয়।

যেমন – সারাটি সকাল তোমার আশায় বসে আছি। ন্যাকামিটা এখন রাখ।

(গ) নির্দেশক সর্বনামের পরে টা, টি যুক্ত হলে তা সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়।

যেমন – ওটি যেন কার তৈরি? এটা নয় ওটা আন। সেইটেই ছিল আমার প্রিয় কলম।

(ঘ) ‘টা’ কিছুটা অবজ্ঞার ভাব প্রকাশ করে এবং ‘টি’ কিছুটা পরিশীলিত ভাব প্রকাশ করে।

যেমন – লোকটা পাগল। লোকটি যথেষ্ট ভদ্র। অবজ্ঞার ভাব থাকায় ‘চোরটা’ হয় কিন্তু ‘অধ্যাপকটা’ হয় না।

২. ‘গোটা’ বচনবাচক শব্দের আগে বসে এবং খান, খানা, খানি পরে বসে। এগুলো নির্দেশক ও অনির্দেশক দুই অর্থেই প্রযোজ্য। ‘গোটা’ শব্দ আগে বসে এবং সংশ্লিষ্ট পদটি নির্দিষ্টতা না বুঝিয়ে অনির্দিষ্টতা বোঝায়। যেমন –

– গোটা দেশটাই ছারখার হয়ে গেছে।

– গোটা দুই কমলালেবু আছে।

– গোটা সাতেক আম এনো।

– একখানা/একখান বই কিনে নিও (অনির্দিষ্ট)।

– দু খানা কম্বল চেয়েছিলাম (নির্দিষ্ট)।

কিন্তু কবিতায় বিশেষ অর্থে ‘খানি’ নির্দিষ্টার্থে ব্যবহৃত হয়। যথা –  ‘আমি অভাগা এনেছি বহিয়া নয়ন জলে ব্যর্থ সাধনখানি।

৩. টাক, টুক, টুকু, টো ইত্যাদি পদাশ্রিত নির্দেশক নির্দিষ্টতা ও অনিষ্টতা উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

যেমন – পোয়াটাক দুধ দাও (অনির্দিষ্টতা) সবটুকু ওষুধই খেয়ে ফেলো (নির্দিষ্টতা)।

৪. বিশেষ অর্থে, নির্দিষ্টতা জ্ঞাপনে কয়েকটি শব্দ: কেতা, তা, পাটি ইত্যাদি। যেমন –

  • কেতা: এ তিন কেতা জমির দাম দশ হাজার টাকা মাত্র। দশ টাকার পাঁচ কেতা নোট।
  • তা: দশ তা কাগজ দাও।
  • পাটি: আমার এক পাটি জুতো ছিঁড়ে গেছে।

বচন

‘বচন’ একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ সংখ্যার ধারণা। ব্যাকরণে বিশেষ্য বা সর্বনামের সংখ্যাগত ধারণা প্রকাশের উপায়কে বলে বচন। বাংলা ভাষায় বচন দু প্রকার: একবচন ও বহুবচন।

একবচন: যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একটিমাত্র সংখ্যার ধারণা হয় তাকে একবচন বলে। যেমন – সে এলো। মেয়েটি স্কুলে যায় নি।

বহুবচন: যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একের অধিক অর্থাৎ বহুসংখ্যার ধারণা হয় তাকে বহুবচন বলে। যেমন – তারা গেলো। মেয়েরা এখনও আসেনি।

কেবল বিশেষ্য ও সর্বনাম শব্দের বচনভেদ হয়। কোনো কোনো সময় টা, টি, খানা, খানি, গাছা, গাছি ইত্যাদি যোগ করে বিশেষ্যের একবচন নির্দেশ করা হয়। যেমন – গরুটা, বাছুরটা, কলমটা, খাতাখানা, বইখানি, লাঠিগাছা, মালাগাছি ইত্যাদি।

বাংলায় বহুবচন প্রকাশের জন্য রা, এরা, গুলা, গুলো, দিগ, দের প্রভৃতি বিভক্তি যুক্ত হয় এবং তৎসম সাধুরীতিতে সব, সকল, সমুদয়, কুল, বৃন্দ, বর্গ, নিচয়, রাজি, রাশি, পাল, দাম, নিকর, মালা, আবলি প্রভৃতি সমষ্টিবোধক শব্দ ব্যবহৃত হয়।

প্রাণিবাচক-অপ্রণিবাচক এবং ইতর প্রাণিবাচক ও উন্নত প্রাণিবাচক শব্দভেদে বিভিন্ন ধরনের বহুবচনবোধক প্রত্যয় ও সমষ্টিবোধক শব্দ যুক্ত হয়। যেমন –

(ক) কেবল উন্নত প্রাণিবাচক শব্দের সঙ্গে ‘রা’ বহুবচনের ব্যবহার পাওয়া যায়। যেমন – ছাত্ররা খেলা দেখতে গেছে। তারা সকলেই লেখাপড়া করে। শিক্ষকেরা জ্ঞান দান করেন।

সময় সময় কবিতা বা অন্যান্য প্রয়োজনে অপ্রাণী ও ইতর প্রাণিবাচক শব্দেও রা, এরা যুক্ত হয়। যেমন – ‘পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়া হিংসায় পিপীলিকারা বিধাতার কাছে পাখা চায়।’ কাকেরা এক বিরাট সভা করল।

(খ) গুলা, গুলো, গুলি প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক শব্দের বহুবচনে যুক্ত হয়। যেমন – অতগুলো কুমড়া দিয়ে কী হবে? আমগুলো টক। টাকাগুলো দিয়ে দাও। ময়ূরগুলো পুচ্ছ নাড়িয়ে নাচছে।

উল্লেখ্য, তুচ্ছার্থে মানুষের ক্ষেত্রে ‘মানুষগুলো’ ব্যবহৃত হয়। এটি প্রমিত বাংলায় ব্যবহৃত কথ্য বহুবচন প্রত্যয়।

উন্নত প্রাণিবাচক তথা মনুষ্য শব্দের বহুবচনে ব্যবহুত শব্দ:
গণ – দেবগণ, নরগণ, জনগণ।
বৃন্দ – সুধীবৃন্দ, ভক্তবৃন্দ, শিক্ষকবৃন্দ।
মন্ডলী – শিক্ষকমন্ডলী, সম্পাদকমন্ডলী।
বর্গ  – পন্ডিতবর্গ , মন্ত্রীবর্গ।

প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক শব্দে বহুবচনে ব্যবহৃত শব্দ:
কুল – কবিকুল, পক্ষিকুল, মাতৃকুল, বৃক্ষকুল।
সকল – পর্বতসকল, মনুষ্যসকল।
সব – ভাইসব, পাখিসব।
সমূহ – বৃক্ষসমূহ, মনুষ্যসমূহ।

অপ্রাণিবাচক শব্দে ব্যবহৃত বহুবচনবোধক শব্দ:

আবলি, গুচ্ছ, দাম, নিকর, নিচয়, পুঞ্জ, মালা, রাজি, রাশি, দাম, ভার, কলাপ, গ্রাম, চয়, জাল, দল, মন্ডল, সমুদয়। যেমন – পুস্তকাবলি, কবিতাগুচ্ছ, কুসুমদাম, কমলনিকর, মেঘপুঞ্জ, পর্বতমালা, বালিরাশি, কুসুমনিচয়, ক্রিয়াকলাপ, গুণগ্রাম, রিপুচয়, জটাজাল, তারাদল, কেশদাম, তারামন্ডল, গ্রন্থসমুদয়।

দ্রষ্টব্য: পাল ও যূথ শব্দ দুটো কেবল জন্তুর বহুবচনে ব্যবহৃত হয়। যেমন – রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। হস্তিযূথ মাঠের ফসল নষ্ট করছে।

বহুবচনের প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য

(ক) বিশেষ্য শব্দের একবচনের ব্যবহারে অনেক সময় বহুবচন বোঝানো হয়। যেমন –

  • সিংহ বনে থাকে (একবচন ও বহুবচন দুটো বোঝায়)।
  • পোকার আক্রমণে ফসল নষ্ট হয় (বহুবচন)।
  • বাজার লোক জমেছে (বহুবচন)।
  • বাগানে ফুল ফুটেছে (বহুবচন)।

(খ) একবচনাত্মক বিশেষ্যের আগে অজস্র, বিস্তর, বহু, নানা, ঢের, প্রচুর, বেশ, অঢেল, অনেক, বিপুল, হরেক ইত্যাদি বহুত্ববোধক শব্দ বিশেষণ হিসেবে প্রয়োগ করেও বহুবচন বোঝানো হয়। যেমন –

  • অজস্র লোক,
  • অনেক ছাত্র,
  • বিস্তর টাকা,
  • বহু মেহমান,
  • নানা কথা,
  • ঢের খরচ,
  • অঢেল টাকা-পয়সা ইত্যাদি।

(গ) অনেক সময় বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের দ্বিত্ব প্রয়োগেও বহু বচন সাধিত হয়। যেমন –

  • হাঁড়ি হাঁড়ি সন্দেশ।
  • কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
  • বড় বড় মাঠ।
  • লাল লাল ফুল।

(ঘ) বিশেষ নিয়মে সাধিত বহুবচন। যেমন –

  • মেয়েরা কানাকানি করছে।
  • এটাই করিমদের বাড়ি।
  • রবীন্দ্রনাথরা প্রতি দিন জন্মায় না।
  • সকলে সব জানে না।

(ঙ) কতিপয় বিদেশি শব্দে সে ভাষার অনুসরণে বহুবচন হয়।

  • আন-যোগে: বুজুর্গ-বুজুর্গান, সাহেব-সাহেবান।
  • আত-যোগে: কাগজ-কাগজাত।

দ্রষ্টব্য: একই সঙ্গে দুবার বহুবচনবাচক প্রত্যয় বা শব্দ ব্যবহৃত হয় না। একে বাহুল্য দোষ বলে। যেমন –

  • সব মানুষই অথবা মানুষেরা মরণশীল (শুদ্ধ)।
  • সকল মানুষেরাই মরণশীল (ভুল)।

লৈঙ্গিক শব্দ

সব ভাষায় লিঙ্গভেদে শব্দভেদ আছে। অনুরূপভাবে বাংলা ভাষায় বহু বিশেষ্য পদ রয়েছে যাদের কোনোটিতে পুরুষ ও কোনোটিতে স্ত্রী বোঝায়। যে শব্দে পুরুষ বোঝায় তাকে পুরুষবাচক শব্দ আর যে শব্দে স্ত্রী বোঝায় তাকে স্ত্রীবাচক শব্দ বলে। যেমন: বাপ-মা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে; এখানে বাপ, ভাই ও ছেলে পুরুষবাচক শব্দ আর মা, বোন ও মেয়ে স্ত্রীবাচক শব্দ।

তৎসম পুরুষবাচক বিশেষ্য শব্দের সঙ্গে পুরুষবাচক বিশেষণ ব্যবহৃত এবং স্ত্রীবাচক বিশেষ্য শব্দের সঙ্গে স্ত্রীবাচক বিশেষণ ব্যবহৃত হয়। যেমন – বিদ্বান লোক এবং বিদুষী নারী। কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সংস্কৃত ব্যাকরণের এ নিয়ম মানা হয় না। যেমন – সংস্কৃতে ‘সুন্দর বালক ও সুন্দরী বালিকা’ বাংলায় ‘সুন্দর বালক ও সুন্দর বলিকা।

বাংলায় পুরুষ ও স্ত্রী বাচক শব্দ মূলত দুভাগে বিভক্ত:

(ক) পতি ও পত্নীবাচক: আব্বা-আম্মা, চাচা-চাচি, কাকা-কাকি, জেঠা-জেঠি, দাদা-দাদি, নানা-নানি, নান্দাই-ননদ, দেওর-জা, ভাই-ভাবি, দাদা-বৌদি, বাবা-মা, মামা-মামি ইত্যাদি।

(খ) পুরুষ ও স্ত্রীবাচক: খোকা-খুকি, পাগল-পাগলি, বামন-বামনি, ভেড়া-ভেড়ি, মোরগ-মুরগি, বালক-বালিকা, দেওর-ননদ, ভাই-বোন ইত্যাদি।

বাংলা স্ত্রী প্রত্যয়:
পুরুষবাচক শব্দের সঙ্গে কতকগুলো প্রত্যয় যোগ করে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠন করা হয়। এগুলো হল: ই, নি, আনি, ইনী, ন।
যেমন –

  • বেঙ্গমা-বেঙ্গমি, ভাগনা/ভাগনে-ভাগনি,
  • কামার-কামারনি, জেলে-জেলেনি,
  • কুমার-কুমারনি,
  • ধোপা-ধোপানি,
  • মজুর-মজুরনি,
  • ভিখারী-ভিখারিনী,
  • ঠাকুর-ঠাকুরানি,
  • মেথর-মেথরানি,
  • চাকর-চাকরানি,
  • কাঙাল-কাঙালিনী,
  • গোয়ালা-গোয়ালিনী,
  • বাঘ-বাঘিনী ইত্যাদি,
  • ঠাকুর-ঠাকরুন/ঠাকুরানি,
  • ঠাকুর-ঠাকুরাইন,
  • অভাগা-অভাগি/অভাগিনী,
  • ননদাই-ননদিনী/ননদি ইত্যাদি।

অনেক সময় আলাদা আলাদা শব্দে পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক বোঝায়। যেমন:

  • বাবা-মা, ভাই-বোন,
  • কর্তা-গিন্নী,
  • ছেলে-মেয়ে,
  • সাহেব-বিবি,
  • জামাই-মেয়ে,
  • বর-কনে,
  • দুলহা-দুলাইন/দুলহিন,
  • বেয়াই-বেয়াইন,
  • তাঐ-মাঐ,
  • বাদশা-বেগম,
  • শুক-শারি ইত্যাদি।

সংস্কৃত স্ত্রী প্রত্যয়:
তৎসম পুরুষবাচক শব্দের পরে আ, ঈ, আনী, নী, ইকা প্রভৃতি প্রত্যয়যোগে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়। যেমন –

(ক) সাধারণ অর্থে : মৃত-মৃতা, বিবাহিত- বিবাহিতা, মাননীয়-মাননীয়া, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, প্রিয়-প্রিয়া, প্রথম-প্রথমা, চতুর-চতুরা, চপল-চপলা, নবীন-নবীনা, কনিষ্ঠ-কনিষ্ঠা, মলিন-মলিনা, নিশাচর-নিশাচরী, ভয়ংকর-ভয়ংকরী, রজক-রজকী, কিশোর-কিশোরী, সুন্দর-সুন্দরী, চতুর্দশ-চতুর্দশী, ষোড়শ-ষোড়শী ইত্যাদি।

(খ) জাতি বা শ্রেণিবাচক অর্থে: অজ-অজা, কোকিল-কোকিলা, শিষ্য-শিষ্যা, ক্ষত্রিয়া, শূদ্র-শূদ্রা, সিংহ-সিংহী, ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী, মানব-মানবী, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী, কুমার-কুমারী, ময়ূর-ময়ূরী ইত্যাদি।

(গ) ইকা-প্রত্যয় যোগে: বালক-বালিকা, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, সেবক-সেবিকা, অধ্যাপক-অধ্যাপিকা ইত্যাদি। কিন্তু গণক-গণকী, নর্তক-নর্তকী, চাতক-চাতকী, রজক-রজকী, (বাংলায়) রজকিনী।

(ঘ) আনী, ঈনী, নী-প্রত্যয় যোগে: ইন্দ্র-ইন্দ্রানী, মাতুল-মাতুলানী, আচার্য-আচার্যানী, মায়াবী-মায়াবিনী, কুহক-কুহকিনী, যোগী-যোগিনী, মেধাবী-মেধাবিনী, দুঃখ-দুঃখিনী ইত্যাদি।

যে সব পুরুষবাচক শব্দের শেষে ‘তা’ রয়েছে, স্ত্রীবাচক বোঝাতে সে সব শব্দে ‘ত্রী’ হয়। যেমন  – নেতা-নেত্রী, কর্তা-কর্ত্রী, শ্রোতা-শ্রোত্রী, ধাতা-ধাত্রী।

পুরুষবাচক শব্দের শেষে অত্, বান্, মান্, ঈয়ান থাকলে যথাক্রমে অতী, বতী, মতি, ঈয়াসী হয়। যথা: সৎ-সতী, মহৎ-মহতী, গুণবান-গুণবতী, রুপবান-রুপবতী, শ্রীমান-শ্রীমতী, বুদ্ধিমান-বুদ্ধিমতী, গরীয়ান-গরীয়সী।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকণিকা

নিত্য স্ত্রীবাচক বাংলা শব্দ: এগুলোর পুরুষবাচক শব্দ নেই। যেমন – সতীন, সৎমা, এয়ো, দাই, সধবা, রূপসি, সজনি, অঙ্গনা, খাতুন, কলঙ্কিনী, বাঈজি, ডাইনি, পেত্নি, শাঁখচুন্নি, বারবনিতা।

নিত্য স্ত্রীবাচক তৎসম শব্দ: সতীন, সৎমা, সধবা, অর্ধাঙ্গিনী, কুলটা, অসূর্যম্পশ্যা, অরক্ষণীয়া, সপপত্নী, রজঃস্বলা।

বিদেশী স্ত্রীবাচক শব্দ: খান-খানম, মরদ-জেনানা, মালেক-মালেকা, মুহতারিম-মুহতারিমা, সুলতান- সুলতানা, হুজুর-হুজুরাইন।

নিত্য পুরুষবাচক শব্দ: কবিরাজ, ঢাকী, কৃতদার, অকৃতদার, রাষ্ট্রপতি, সেনাপতি, দলপতি, বিচারপতি, সভাপতি, পুরোহিত, কাপুরুষ, যোদ্ধা, নবী, রাসুল, মোল্লা, জল্লাদ, গুণ্ডা, লম্পট।

কতকগুলো বাংলা শব্দে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই বোঝায়। যেমন – জন, জনতা, পাখি, শিশু, সন্তান, শিক্ষিত, গুরু, বঁধু, মানুষ, গরু।

কিছু পুরুষ বাচক শব্দের দুটো করে স্ত্রীবাচক শব্দ রয়েছে। যথা –

  • দেবর-ননদ (দেবরের বোন) এবং জা (দেবরের স্ত্রী),
  • ভাই-বোন এবং ভাবী (ভাইয়ের স্ত্রী),
  • শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী (পেশা অর্থে) এবং শিক্ষকপত্নী (শিক্ষকের স্ত্রী),
  • বন্ধু-বান্ধবী (মেয়ে বন্ধু) এবং বন্ধুপত্নী  (বন্ধুর স্ত্রী),
  • দাদা-দিদি (বড় বোন) এবং বৌদি (দাদার স্ত্রী),
  • শূদ্র-শূদ্রা (শূদ্র জাতীয় স্ত্রীলোক) এবং শূদ্রানী (শূদ্রের স্ত্রী) ইত্যাদি।

ক্ষুদ্রার্থে ইকা-প্রত্যয় যোগ হয়। যেমন:

  • নাটক-নাটিকা,
  • মালা-মালিকা,
  • গীত-গীতিকা,
  • পুস্তক-পুস্তিকা,
  • একাঙ্ক-একাঙ্কিকা,
  • ব্যাকরণ-ব্যাকরণিকা,
  • চয়ন-চয়নিকা ইত্যাদি।

আনী-প্রত্যয় যোগে কোনো কোনো সময় অর্থের পার্থক্য ঘটে। যেমন –

  • অরণ্য-অরণ্যানী (বৃহৎ অরণ্য),
  • হিম-হিমানী (জমানো বরফ),
  • বন-বনানী (বড় বন) ইত্যাদি।

নী-প্রত্যয় যোগে গঠিত স্ত্রীবাচক শব্দে অবজ্ঞা অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন –

  • ডাক্তারনী, মাস্টারনী, জমিদারনী, দারোগানী।

কুল-উপাধিরও স্ত্রীবাচকতা রয়েছে। যেমন:

  • ঘোষ (পুরুষ)-ঘোষজা (কন্যা অর্থে),
  • ঘোষাজায়া (পত্নী অর্থে)।

বাংলা স্ত্রীবাচক শব্দের বিশেষণ স্ত্রীবাচক হয় না। যেমন:

  • সুন্দর বলদ-সুন্দর গাই,
  • সুন্দর ছেলে-সুন্দর মেয়ে,
  • মেজ খুড়ো-মেজ খুড়ি ইত্যাদি।

বিধেয় বিশেষণ অর্থাৎ বিশেষ্যের পরবর্তী বিশেষণও স্ত্রীবাচক হয় না। যেমন –

  • মেয়েটি পাগল হয়ে গেছে (পাগলি হয়ে গেছে হবে না)
  • আসমা ভয়ে অস্থির (অস্থিরা হবে না)।

বিশেষ নিয়মে গঠিত স্ত্রীবাচক শব্দের উদাহরণ। যেমন –

  • সম্রাট – সম্রাজ্ঞী,
  • রাজা-রানি,
  • যুবক-যুবতী,
  • শ্বশুর-শ্বশ্রূ,
  • নর-নারী,
  • বন্ধু-বান্ধবী,
  • দেবর-জা,
  • শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী,
  • স্বামী-স্ত্রী,
  • পতি-পত্নী,
  • সভাপতি-সভানেত্রী ইত্যাদি।

নমুনা প্রশ্ন

১. অজমূর্খ শব্দের ‘অজ’ কোন জাতের উপসর্গ?

ক) সংস্কৃত

খ) বাংলা

গ) বিদেশি

ঘ) তৎসম

উত্তরঃ খ

২. খাঁটি বাংলা উপসর্গ যোগে সৃষ্ট শব্দ –

ক) আকণ্ঠ

খ) অবেলা

গ) অপমান

ঘ) অতিশয়

উত্তরঃ খ

৩. উপসর্গ কোনটি?

ক) থেকে

খ) অতি

গ) আমি

ঘ) যথা

উত্তরঃ খ

৪. অপমান শব্দের ‘অপ’ উপসর্গটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে –

ক) বিপরীত

খ) নিকৃষ্ট

গ) বিকৃত

ঘ) অভাব

উত্তরঃ ক

৫. ‘লাপাত্তা’ শব্দের উপসর্গটি এসেছে – 

ক) আরবি থেকে

খ) হিন্দি থেকে

গ) ফারসি থেকে

ঘ) বাংলা থেকে

উত্তরঃ ক

৬. কোন শব্দে বিদেশি উপসর্গ ব্যবহৃত হয়েছে –

ক) আনমনা

খ) নিমরাজি

গ) অবহেলা

ঘ) নিখুঁত

উত্তরঃ খ

৭. ‘নিদাঘ’ শব্দটিতে কোন প্রকারের উপসর্গ আছে – 

ক) খাঁটি বাংলা

খ) হিন্দি

গ) ফারসি

ঘ) তৎসম

উত্তরঃ ঘ

৮. ‘নিমরাজি’ শব্দের ‘নিম’ উপসর্গটি কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

ক) সহিত

খ) হ্যাঁবোধক

গ) অল্প

ঘ) আধা

উত্তরঃ ঘ

৯. ‘লক্ষ লক্ষ হাঘরে দুর্গত’ এখানে ‘হা’ উপসর্গটি কি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

ক) পূর্ণতা

খ) উৎকৃষ্ট

গ) মন্দ

ঘ) অভাব

উত্তরঃ ঘ

১০. কোন শব্দে উপসর্গটি ‘সহিত’ অর্থ প্রকাশ করে?

ক) বরদাস্ত

খ) বকলম

গ) নারাজ

ঘ) বেতার

উত্তরঃ খ

১১. কোনটি তৎসম উপসর্গ?

ক) নিলাজ

খ) সুনজর

গ) বিপক্ষ

ঘ) বিভূঁই

উত্তরঃ গ

১২. উপসর্গের কী নেই?

ক) অর্থদ্যোতকতা

খ) অর্থ পরিবর্তনের ক্ষমতা

গ) অর্থসংকোচন ক্ষমতা

ঘ) অর্থবাচকতা

উত্তরঃ ঘ

১৩. কোনটি ফারসি উপসর্গ?

ক) গর

খ) বর

গ) রাম

ঘ) অঘা

উত্তরঃ খ

১৪. ‘উৎপন্ন’ শব্দটি কীভাবে গঠিত হয়েছে?

ক) উপসর্গের মাধ্যমে

খ) সন্ধির মাধ্যমে

গ) সমাসের মাধ্যমে

ঘ) প্রত্যয়ের মাধ্যমে

উত্তরঃ ক

১৫. কোনটি আরবি উপসর্গ?

ক) গর

খ) না

গ) ফি

ঘ) নিম

উত্তরঃ ক

১৬. কোনটি বাংলা উপসর্গ?

ক) আড়

খ) পরা

গ) সম

ঘ) নির

উত্তরঃ ক

১৭. ‘উৎকর্ষ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে-

ক) প্রত্যয় দ্বারা

খ) উপসর্গ দ্বারা

গ) প্রত্যয় ও উপসর্গ দ্বারা

ঘ) সমাস দ্বারা

উত্তরঃ গ

১৮. নির্দেশক সর্বনামের পরে ‘টা/টি’ যুক্ত হলে তা কী হয়?

ক) অনির্দিষ্ট

খ) উৎকৃষ্ট

গ) সুনির্দিষ্ট

ঘ) নিকৃষ্ট

উত্তরঃ গ

১৯. বিশেষ অর্থে নির্দিষ্টতা বুঝায় কোনটি?

ক) সবটুকু ওষুধ

খ) এক পাটি জুতো

গ) গোটা সাতেক আম

ঘ) দশটি বছর

উত্তরঃ খ

২০. যে প্রত্যয় নির্দিষ্টতা বুঝায় তার নাম কী?

ক) সংখ্যা

খ) পদাশ্রিত নির্দেশক

গ) লিঙ্গ

ঘ) উপসর্গ

উত্তরঃ খ

২১. পদাশ্রিত নির্দেশক আলোচিত হয়-

ক) বাক্যতত্ত্বে

খ) রূপতত্ত্বে

গ) ধ্বনিতত্ত্বে

ঘ) অর্থতত্ত্বে

উত্তরঃ খ

২২. পদাশ্রিত নির্দেশক কোন পদ?

ক) ক্রিয়া

খ) অব্যয়

গ) সর্বনাম

ঘ) বিশেষ্য

উত্তরঃ খ

২৩. ‘এক’ শব্দের সঙ্গে টা, টি যুক্ত হলে তা কী হয়?

ক) নির্দিষ্টতা

খ) অনির্দিষ্টতা

গ) নিরর্থক

ঘ) অবজ্ঞা

উত্তরঃ খ

২৪. ‘ন্যাকামিটা এখন রাখ।’ এ বাক্যে পদাশ্রিত নির্দেশকের ব্যবহার হয়েছে-

ক) নিরর্থকভাবে

খ) নির্দেশকভাবে

গ) অনির্দেশকভাবে

ঘ) ক+গ

উত্তরঃ ক

২৫. “সারাটি সকাল তোমার আশায় বসে আছি।” এবাক্যে ‘টি’ কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

ক) নিরর্থকভাবে

খ) নির্দিষ্টতা অর্থে

গ) অনির্দিষ্টতা অর্থে

ঘ) সার্থকভাবে

উত্তরঃ ক

২৬. কোনটিতে প্রয়োগভেদে পদাশ্রিত নির্দেশকের বিভিন্নতা প্রযুক্ত হয়?

ক) ক্রিয়া

খ) বচন

গ) কারক

ঘ) লিঙ্গ

উত্তরঃ খ

২৭. ‘রা’ বিভক্তির ব্যবহার কোন ধরনের শব্দের সঙ্গে পাওয়া যায়?

ক) প্রাণিবাচক

খ) অপ্রাণিবাচক

গ) সংখ্যাবাচক

ঘ) উন্নত প্রাণিবাচক

উত্তরঃ ঘ

২৮. কোন পদের শব্দের বচনভেদ হয় না?

ক) বিশেষ্য

খ) অব্যয়

গ) সর্বনাম

ঘ) কোনোটিই নয়

উত্তরঃ খ

২৯. বিশেষ্য শব্দের একবচনের ব্যবহারেও অনেক সময় বহুবচন বোঝানো হয়, যেমন – 

ক) বাগানে ফুল ফুটেছে

খ) সকলে সব জানে না

গ) মানুষেরা মরণশীল

ঘ) কবিরা ভাবুক

উত্তরঃ ক

৩০. বিদেশি ভাষার অনুসরণে বহুবচন হয়েছে কোনটি?

ক) কাগজ-কগজাত

খ) হস্তি-হস্তিযূথ

গ) মানুষ-মানুষসকল

ঘ) নারী-নারীমহল

উত্তরঃ ক

৩১. ইতর প্রাণিবাচক শব্দের বহুবচনে কোনটি যুক্ত হয়?

ক) রা

খ) বৃন্দ

গ) দাম

ঘ) গুলো

উত্তরঃ ঘ

৩২. কেবল জন্তুর বহুবচনে ব্যবহৃত হয় কোনটি?

ক) পাল

খ) মালা

গ) রাজি

ঘ) নিকর

উত্তরঃ ক

৩৩. কেবল অপ্রাণিবাচক শব্দে ব্যবহৃত বহুবচনবোধক শব্দ কোনটি?

ক) কুল

খ) সকল

গ) নিকর

ঘ) সব

উত্তরঃ গ

৩৪. কোন শব্দে ক্ষুদ্রার্থে ‘ইকা’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে – 

ক) মালিকা

খ) বালিকা

গ) অধ্যাপিকা

ঘ) সেবিকা

উত্তরঃ ক

৩৫. কোন শব্দটির পুরুষবাচক শব্দ নেই?

ক) বেগম

খ) এয়ো

গ) শারি

ঘ) খানম

উত্তরঃ খ

৩৬. ‘ঘোষজা’ কোন অর্থে স্ত্রীবাচক?

ক) পত্নী অর্থে

খ) কন্যা অর্থে

গ) বোন অর্থে

ঘ) বৃহৎ অর্থে

উত্তরঃ খ

৩৭. কোনটি পুরুষবাচক শব্দ?

ক) ঠাকরুন

খ) দুলহিন

গ) বেয়াইন

ঘ) বেঙ্গমা

উত্তরঃ ঘ

৩৮. নীচের কোনটি ব্যতিক্রম?

ক) বুজুর্গান

খ) ঘোষজা

গ) বিবাহিতা

ঘ) দুলাইন

উত্তরঃ ক

৩৯. নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ নয় কোনটি?

ক) কুলটা

খ) জেনানা

গ) সতীন

ঘ) বাইজি

উত্তরঃ খ

৪০. লিঙ্গান্তর হয় না এমন শব্দ কোনটি?

ক) সাহেব

খ) কবিরাজ

গ) বেয়াই

ঘ) সঙ্গী

উত্তরঃ খ

৪১. ‘বিধবা’ শব্দের বিপরীত লিঙ্গ কী?

ক) সধবা

খ) বিপত্নীক

গ) অধবা

ঘ) সপত্নীক

উত্তরঃ খ

৪২. কোনটি ভিন্নার্থক স্ত্রীবাচক শব্দ?

ক) কাঠি

খ) পুস্তিকা

গ) বনানী

ঘ) মালিকা

উত্তরঃ গ

৪৩. ‘শুক’ শব্দের স্ত্রীবাচক রূপ কোনটি?

ক) শুখি

খ) শারি

গ) সারী

ঘ) শুখী

উত্তরঃ খ

৪৪. বিশেষ নিয়মে সাধিত স্ত্রীবাচক শব্দ কোনটি?

ক) নেত্রী

খ) কর্মী

গ) প্রিয়া

ঘ) মহিলা পুলিশ

উত্তরঃ ক

৪৫. কোনটি নিত্য পুরুষবাচক শব্দ?

ক) কাপুরুষ

খ) কবি

গ) বাদশা

ঘ) নেতা

উত্তরঃ ক

৪৬. ক্ষুদ্রার্থে গঠিত কোনটি?

ক) গীতিকা

খ) চাতকী

গ) সতীন

ঘ) মানবী

উত্তরঃ ক

৪৭. কোনটি প্রত্যয়যোগে গঠিত স্ত্রীবাচক শব্দ?

ক) বোন

খ) মা

গ) মামি

ঘ) কনে

উত্তরঃ গ

৪৮. কোনটি নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ নয়?

ক) এয়ো

খ) বেগম

গ) দাই

ঘ) সৎমা

উত্তরঃ খ

৪৯. কোন শব্দ দ্বারা স্ত্রী ও পুরুষ দুটো বোঝায়?

ক) ঢাকী

খ) কবিরাজ

গ) শিক্ষিত

ঘ) ক + গ

উত্তরঃ গ

৫০. ‘ইকা’ যোগে ক্ষুদ্রার্থে গঠিত শব্দ – 

ক) সেবিকা

খ) একাঙ্কিকা

গ) বালিকা

ঘ) গায়িকা

উত্তরঃ খ

৫১. কোনটি পতি ও পত্নীবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়?

ক) পাগল-পাগলি

খ) দেওর-ননদ

গ) দেওর-জা

ঘ) বামন-বামনী

উত্তরঃ গ

৫২. কোনটি নিত্য পুরুষবাচক শব্দ?

ক) বাবা

খ) সন্তান

গ) ঢাকী

ঘ) কুলটা

উত্তরঃ গ

৫৩. বৃহদার্থে ‘আনী’ যোগ হয়েছে কোনটিতে?

ক) ডাক্তারনি

খ) অভাগিনী

গ) ইন্দ্রানী

ঘ) হিমানী

উত্তরঃ ঘ

৫৪. ‘য’ ফলা লোপ পেয়ে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়েছে কোনটি?

ক) রজকী

খ) বৈষ্ণী

গ) মৎসী

ঘ) যোগী

উত্তরঃ গ

৫৫. কোনটি দ্বারা শুধু স্ত্রীবাচকতা বোঝায়?

ক) দিদি

খ) গীতিকা

গ) হিমানী

ঘ) সধবা

উত্তরঃ ঘ

৫৬. কোনটি দ্বারা পুরুষ-স্ত্রী উভয়ই বোঝায়?

ক) যোদ্ধা

খ) নবি

গ) শিশু

ঘ) কবি

উত্তরঃ গ

৫৭. ‘কুলি’ শব্দের স্ত্রীবাচক রূপ কী?

ক) কুলিনী

খ) কুলিরস্ত্রী

গ) মহিলা কুলি

ঘ) কামিন

উত্তরঃ ঘ

৫৮. বিশেষ নিয়মে সাধিত স্ত্রীবাচক শব্দ কোনটি?

ক) সম্রাট সম্রাজ্ঞী

খ) দুঃখী- দুঃখিনী

গ) ঠাকুর-ঠাকুরুন

ঘ) মালা-মালিকা

উত্তরঃ ক

৫৯. শূদ্র জাতীয় স্ত্রীলোককে বলে – 

ক) শূদ্র

খ) শূদ্রা

গ) শূদ্রানী

ঘ) খ + গ

উত্তরঃ ঘ

৬০. বাংলায় কতকগুলো তৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের পরে আবার স্ত্রীবাচক প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়, এরূপ উদাহরণ – 

ক) গরীয়ান-গরীয়সী

খ) অভাগা-অভাগিনী

গ) মানী-মানিনী

ঘ) রজক-রজকী

উত্তরঃ খ

তথ্যসূত্র:

১. রফিকুল ইসলাম, পবিত্র সরকার ও মাহবুবুল হক, প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ (বাংলা একাডেমি, জানুয়ারি ২০১৪)
২. রফিকুল ইসলাম ও পবিত্র সরকার, প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, প্রথম খন্ড (বাংলা একাডেমি, ডিসেম্বর ২০১১)
৩. মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩)
৪. নির্মল দাশ, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও তার ক্রমবিকাশ (বিশ্বভারতী ২০০০)
৫. কাজী দীন মুহম্মদ ও সুকুমার সেন, অভিনব ব্যাকরণ (ঢাকা ১৯৪৮)
৬. মুহম্মদ আবদুল হাই, ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব (১৯৬৪)
৭. ড. হায়াৎ মামুদ, ভাষাশিক্ষা : বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি (২০০৪)
৮. ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান, ভাষাবিধি : বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও প্রবন্ধ রচনা (আদিল ব্রাদার্স, জানুয়ারি ২০০৯)
৯. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা (অগ্নি পাবলিকেশন্স, এপ্রিল ২০০৪)
১০. ড. মুহম্মদ এনামুল হক ও শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (বাংলা একাডেমি, স্বরবর্ণ অংশ: ডিসেম্বর ১৯৭৪ ও ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ: জুন ১৯৮৪)
১১. স্বরোচিষ সরকার, বাংলাদেশের কোষগ্রন্থ ও শব্দসন্ধান (বাংলা একাডেমি, মে ২০১০)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *